ছোটবেলা থেকে একা একা পথ চলতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। প্রিয় বন্ধুটি চলে গেল তের বছর বয়সেই। বাল্যশিক্ষার পর বাবুও আমার সঙ্গে আর
হাঁটল না পরাশুনার জগতে। মার দায়িত্ত্ব বরাবরই খাওয়া পড়ার মধ্যে সীমিত ছিল।
দিদিমার আশা ছিল অনেক, এখনো অনেক আশা রাখে আমার উপর, দিদিমা চাকরি
করত, এটা যেন আমার চাকরি করার সমানই। তবুও প্রকৃতপক্ষে আমার একটা
নিজস্ব জীবন ছিল, একটা নিজস্ব চিন্তাভাবনা ছিল, একটা আলাদা জগত ছিল যেখানে শুধু
আমিই বিচরন করতাম। কোনোদিন বোন এবং ভাইয়ের সঙ্গে এক বাতি বা এক বিছানা পরাশুনার
জন্য শেয়ার করা হয়নি। নাইনে উঠার পর ত আলাদা ঘরই বানিয়ে দিল বাবু। আর্থিক অনটনের
মধ্যেও বাবুর এই উদারতার জন্য বাবুর কাছে সবসময়ই অনেক বেশী ঋণী। সাইকেল কিনে দেয়া,
টাউন এ মাস্টার এর বাড়িতে পাঠানো-বাবু এমন সময় করেছে আমার জন্য বা এমন পরিবেশে
করেছে যেটা কল্পনার বাইরে। অন্য বন্ধুদের বাবুরা শুধু সাপোর্ট করেনি তাই নয়, সবরকম
ভাবে নিন্দা করেছে। সামর্থ্য নেই অথচ ছেলেকে গাছে তুলছে ইত্যাদি। আমার প্রতি বাবুর
একটা বিশ্বাস ছিল-অথচ মুখে কোনোদিন কিছু বলত না। কোনোদিন লাঙ্গল ধরতে বলেনি বা
সবজি খেতে জল দিতেও বলেনি। আর দশটা ছেলের মতই বড় হতে দিয়েছে-স্বাধীনতা দিয়েছে।
কোনোদিন এর অপব্যবহার করিনি-এজন্য ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞ। সবকিছুর পরেও আমার জীবন,
আমার পরাশুনা, আমার পথচলা-একাই ছিল, না বাবু, না বোন, না ভাই, না মা, এমন কি দিদিমাও এই পথ চলার
সঙ্গী কোনোদিন হয়নি।
“If you want to
Walk Fast,
Walk alone.
But-if you want
to walk far,
Walk together.”
এমন নয় যে কেউ দূরে সরিয়ে
দিয়েছে কিন্তু কেউ কাছেও টানেনি। সবসময় দ্বিতীয় নম্বর পছন্দের ছিলাম। একটা সময়
এতেই সন্তুষ্টও ছিলাম। কিন্তু এর পরিনাম এত বেদনাদায়ক সেটা পড়ে বুঝলাম। নিজেকে
অনেক ছোট মনে হয়, একেবারে অসহায় মনে হয় যখন ওরা অন্য একজনের জীবনের সঙ্গে পথচলার জন্য
প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় নিজের সামনেই। ভালবাসা কখনো হারজিতের নয়, কিন্তু এটাকে ব্যর্থতাই
কেনজানি মনে হয়।
এতদিন পর এমন একজনের সঙ্গে
দেখা হল, যে একদিন স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রানিত করেছিল একযুগ আগে। সে যতটা অপরিচিত ছিল
ঠিক ততটাই ঘনিষ্ঠ ছিল। এতটাই অপরিচিত ছিল যে রাস্তায় কোনোদিন দেখা হলে কথা বলার মত
পরিচয়ও ছিলনা, এতটাই পরিচিত ছিল যে প্রতি মুহূর্তে ওর কথা কোন না কোন ভাবে আসতই।
একটা আদর্শ প্রতিমূর্তি মনে হত। জীবনের পথ চলার কথা ভাবব আর ওর কথা মনে আসবে না
এমন কখনো হয়নি।
জীবন টা ছোট কিন্তু এতও ছোট
নয় যে একা একা চলা যায়। দুজনে মিলে পথ চলার স্বপ্ন অনেকদিনের। ভালবাসার স্বপ্ন
অনেকদিনের। যদি কারুর সঙ্গে পথ চলা যেত। যদি কারুর হাত ধরা যেত। একসঙ্গে পথ চলার
কথা মনে হলেই একটা রোমাঞ্চ জাগে মনের মধ্যে। মানুষের মনটাই হয়ত এমন, আসতে একা আসতে
হয়েছে, যতদিন বেঁচে থাকে, সবসময় কারুর সঙ্গে থাকতে চায়, কেও একা থাকতে চায়না; কারন যাওয়ার সময়ও আবার হয়ত একাই যেতে হবে। আমি এবং আমাদের
মধ্যে যে অনেক পার্থক্য, একটা আত্মীয়তা, সেটা দিন দিন বেশী করে বুঝতে পারছি। যখনই
মনে হয় তোমার সঙ্গে পথ চলব, একটা নতুন অনুপ্রেরনা, একটা নতুন ভাললাগা আসে। মনে হয়
তোমাকে ছাড়া যেন সবকিছুই মূল্যহীন। কী হবে আমি যদি অনেক বড় কিছুও হই, কিন্তু তুমি
আমার পাশে নেই! এর মধ্যে একবিন্দুও আনন্দ নেই। তুমি পাশে থাকলে যাই কিছু করি ভালভাবেই করব সেটা আমার
বিশ্বাস। তোমার সঙ্গে পথ চলাটাই সর্বান্তকরণে চাওয়া।
প্রথম কিছুদিন সবদিক
সামলাতে একটু সমস্যা হয়ছে সত্যিই, বিশেষ করে উচ্চ লক্ষ্যের দিকটা। অনভিজ্ঞতার
কারনেই এমনটা হয়েছিল। সামলাতে শিখেছি। এও বুঝেছি যে ভালবাসা জীবনের সবচেয়ে বড়
অনুপ্রেরনা-একে নিয়ে পথ চলার নামই জীবন অন্যথায় জীবনটা একটা অকেজো দৌড় মনে হয়।
No comments:
Post a Comment